Thursday, February 8, 2024

বিদআত বিষয়ঃ ঠাকুরগাঁও খানকাহ শারীফ (ইসলাম নগর)

লেখকঃ মু: সামশুল হক
উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা
            আমার জ্ঞান হওয়া হতেই দেখতেছি যে, ঈদে মীলাদুন্নাবী এবং ৪ঠা ফাল্গুন উদ্‌যাপন করার জন্য আমরা সপরিবারে খিলাফাতী খানকাহ শারীফে (ঠাকুরগাঁও রোড) আসতাম। মহা সমারোহে ঈদে মীলাদুন্নাবী উদ্‌যাপন করায় আমরা অধীর আগ্রহে ঈদে মীলাদুন্নাবীর জন্য অপেক্ষা করতাম এবং প্রায় প্রতিটি ঈদে মীলাদুন্নাবী উৎসবে শরীক হতাম। কিন্তু অন্য কোথাও ঈদে মীলাদুন্নাবীর চিহ্নমাত্রও দেখা যেতনা। পক্ষান্তরে খিলাফাত বাউন্ডারীর বাহিরে শবে ক্বাদার, শবে বরাত যেমন মহাসমারোহে উদ্‌যাপন করা হয়, এখানে তেমনভাবে হতনা। সে সময় ৪ঠা ফাল্গুনই হাজরাত খালীফার সাঃ জন্ম দিবস হিসেবে উদ্‌যাপন করা হত। হাজরাত মুহাম্মাদ শামসুজ্জুহা সাঃ নিজেকে একাদশ খালীফা সাঃ বলে দাবী করেন। কিন্তু কেন? এ বিষয়গুলি আমার মনে তোলাপাড়া করতে থাকে। ঈদে মীলাদুন্নাবীর সূত্র ধরেই একাদশ খালীফা সাঃ কর্তৃক রচিত এবং খিলাফাতী খানকাহ শারীফ হতে প্রকাশিত পুস্তক/পুস্তিকা থেকে একাদশ খালীফা সাঃ এবং একাদশ খিলাফাত সম্পর্কে উদ্ধৃত অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ আমার দিব্যদৃষ্টি খুলে দেয় (আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত)। এ বিষয়ে কয়েকটি তথ্য তুলে ধরা হল। এতে কোন ভূল ভ্রান্তি থাকলে এবং তা জানালে ভূল ত্রুটি নিরসনে সচেষ্ট হব, ভূল ভ্রান্তি থেকে মুক্ত হব, ইন্‌শাআল্লাহ্‌। বিষয় প্রসঙ্গে কোন কোন উক্তি বা বাক্যের পুনরুল্লেখ বা দ্বিরুক্তি হয়েছে যা মার্জনীয়।
একাদশ খালীফার সাঃ একাদশ খালীফা ঘোষণা/দাবীঃ-
ইসলামের প্রথম খালীফা হাজরাত আবু বাকার সিদ্দিক আঃ হইতে দশম খালীফা হাজরাত হারুন-অর-রশীদ আঃ পর্যন্ত খালীফাগণের খিলাফাতকাল ইতিহাস স্বীকৃত। আর ইহাত সর্বজন বিদিত যে, দ্বাদশ খালীফা হবেন হাজরাত মাহদী আঃ। এখন নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন শুধু একাদশ খালীফা সাঃ সম্পর্কে। হাজরাত মুহাম্মাদ শামসুজ্জুহা সাঃ বাংলা ১৩৫৩ সালে পৌষ মাসে মীলাদুন্নাবী উৎসব মাজলীসে নিজেকে “একাদশ খালীফা” বলিয়া প্রথম ঘোষণা করেন। “ইনকানা লিল্লাহি ফিল আরজি খালিফা” এই হাদীস মর্মে আমি সেই খালীফা – বলে তিঁনি ঘোষণা দেন। উল্লেখ্য যে, হাজরাত মুহাম্মাদ শামসুজ্জুহার সাঃ পূর্বাপর কেউ নিজেকে একাদশ খালীফা বলে দাবী করেন নি।
একাদশ খালীফা দাবীর বিচার্য বিষয়সমূহঃ-
(১) ইসলামী বিধি বিধানের দ্বিতীয় মানদন্ড হচ্ছে হাদীস শারীফ। দেখা যাক, একাদশ খালীফা সাঃ সম্পর্কে হাদীস শারীফে কী বলা হয়েছে?
হাজরাত মুহাম্মাদ সাঃ বলেন –
(ক) আমার পর আর কোনই নাবী হইবেনা। আমার পর খালীফাগণ হইবে।
(খ) ইসলাম প্রবল হইতে বিরত হইবেনা / কিয়ামাত হইবেনা ১২ জন খালীফা না হওয়া পর্যন্ত। প্রত্যেকে কুরায়শ হইতে হইবে।
(২) তাঁর (একাদশ খালীফা সাঃ) পীর আঃ বলেন – আমার হাজরাত শাহ কিবলাহ আঃ এ অধমকে যে আমানত দিয়ে গেছেন, আল্লাহ আমাকেও সে আমানত হুবাহুব দেওয়ার জন্য আপনার মত মহান অস্তিত্ব আমাকে মিলিয়ে দিয়েছেন।
(৩) হাজরাত খালীফার সাঃ স্বভাব সুন্দর দর্শনে তখনকার জ্ঞানী গুনীরা তাঁর “মহামানব” হওয়ারই ভবিষ্যৎবানী কহেন। তন্মধ্যে একদা মালদুয়ার এষ্টেটের ভূ-স্বামী শ্রী টঙ্কনাথ চৌধূরী তাঁহার হাজরাত পিতা দর্শন আলী শাহকে বলেন – “খাজাঞ্জি সাহেব, আপনার পুত্র শুধু পুত্র নয়। আপনার পুত্র দূরে ! বহুদূরে ! তাকে ভবিষ্যতে বহু ঊর্ধ্বেই (শোভামান) দেখা যায়। ভবিষ্যতে তা থেকে মতি পয়দা হবে”।
উল্লিখিত বিষয় সমূহ পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে (১)(ক) মোতাবেক তিঁনি নিজেকে নাবী দাবী করেন নাই। (১)(খ) মোতাবেক তিঁনি নিজেকে দ্বাদশ বা ততোধিক খালীফা দাবী করেন নাই। প্রকাশ থাকে যে, হাজরাত মুহাম্মাদ শামসুজ্জুহা সাঃ মুহাম্মাদ বিন আলী উরফে মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়াহ আঃ মধ্যস্থতায় হাজরাত আলীর আঃ বংশে সাবিত আছেন। সুতরাং তিঁনি কুরায়শী, হাশিমী, মুত্তালিবী ও আলাব্বীও বটেন।
‘বুহায়রা ও ওয়ারাকা বিন নাওফিল’ হাজরাত রাসূলের সাঃ রিসালাত সত্যতায় ঐ সাক্ষ্য কহেন। খালীফার সাঃ খিলাফাত সত্যতায় তাঁর পীর হাজরাত আফতাবুজ্জামান আঃ (উক্ত প্রশংসা (২) করনে) এবং জ্ঞানী গুনীদের ভবিষ্যৎবাণী কি সাক্ষী নহেন? বিচার্য বিষয় সমূহে উল্লেখিত হাদীস দুটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, হাদীস দুটির শর্তসমূহ যথাযথ ভাবেই পরিপালিত হয়েছে এবং তাঁর খালীফা দাবী ইসলামী বিধি বিধানের পরিপন্থী নয়। এতে প্রতীয়মান হয় যে, হাজরাত মুহাম্মাদ শামসুজ্জুহা সাঃ বারহাক একাদশ খালীফা। এতে এতটুকু সন্দেহ প্রকাশের অবকাশ মাত্র নেই।
একাদশ খালীফার সাঃ বৈশিষ্ট্যসমূহঃ
একাদশ খালীফা হিসেবে হাজরাত মুহাম্মাদ শামসুজ্জুহা সাঃ অশেষ গুণের অধিকারী। তন্মধ্যে কতিপয় তুলে ধরার চেষ্টা করছিঃ-
(১) একাদশ খালীফা সাঃ বলেনঃ- উলুম আজাম মুহাম্মাদ রাসূলের সাঃ মধ্যে আমিই তাঁর একমাত্র উলুল আজাম খালীফা। তাঁর পূর্ণ চরিত্রের বয়ান দেওয়াই আমার খিলাফাতের মূখ্যতম উদ্দেশ্য। বীথিকাই আমার সে তাফসীলী বয়ান।
(২) একাদশ খালীফা সাঃ বলেনঃ- আমি শুধু অমাধ্যস্থিক ও কাশফ সূত্রে অবগত নই। আমি মাধ্যস্থিক ওহী সূত্রেও ইয়াকীন যে, আমি বারহাক আল্লাহর খালীফা।
(৩) হাজরাত রাসূল সাঃ বলেনঃ- যদি হয় জমিনে আল্লাহর একজন খালীফা, এমন যে তিনি পিঠে মারেন ও মাল লয়েন তবেও তার আনুগত্য কর। যদি না হয়, তবে মরিয়া যাও গাছের শিকর কামড়াইয়া (মিশকাত)। হাজরাত মুহাম্মাদ শামসুজ্জুহা সাঃ একাদশ খালীফাই উক্ত খালীফা।
(৪) হাজরাত মুহাম্মাদ শামসুজ্জুহা সাঃ মাত্র ২৬ বছর বয়সে আপন পীর কর্তৃক সকল ত্বারীকাহরই আমীরী (পীরত্ব বা খিলাফাত প্রাপ্ত হন)।
(৫) তিঁনি যথাসম্ভব মূয়ামালাহ সকল তাঁর পীর কিবলা হাজরাত আফতাবুজ্জামানকেও আঃ জানাতেন। …….তিঁনি তাঁর পীরের প্রথম শ্রেণীর প্রথম, প্রধান ও প্রিয়তম খালীফা ছিলেন। তাঁর পীর তাঁকে না দেখিয়ে কোন জটিল মাসয়ালারও সমাধান দিতেন না।
(৬) হাজরাত খালীফা সাঃ বলেনঃ- পীরী-মুরীদী করা বা সালিকিনদের শিক্ষা দেওয়া বা জনগণকে উপদেশ দান করা আমার সৃষ্টির উদ্দ্যেশ্য নয়। আমার যা কাজ, তার তুলনায় উক্ত সকল করা সামান্য ও নগণ্য। মুজমাল দ্বীনকে তাফসীলে পরিণত করাই আমার সৃষ্টির একমাত্র উদ্দেশ্য, আমার খিলাফাতের মূখ্যতম উদ্দ্যেশ্য। এমতাবস্থায় যারা আমার সাথে সম্পর্ক রাখে, তারা চরম আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ করে। বীথিকাই আমার সে তাফসীলী গ্রন্থ। বীথিকা শারীয়াত ভিত্তিরই উপর অর্থাৎ আহ্‌লি সুন্নাত ওয়াল জামায়াত ভিত্তিরই উপর প্রতিষ্ঠিত।
(৭) হাজরাত খালীফা সাঃ এক পত্রে লিখেনঃ- হাজরাত রাসূলুল্লাহ সাঃ যে প্রকার “ফায়তু বি সুরাতিম মিম্‌ মিসলিহি”- তোমরা একটি সূরার অনুরূপ আর একটি সূরা লইয়া আস এই চ্যালেঞ্জ করিয়াছিলেন, সেই প্রকার আমিও আমার খিলাফাতের সত্যতায় চ্যালেঞ্জ করিতেছি যে, আপনারাও সমগ্র জগত মিলিয়া আমার একাদশ খিলাফাত পুস্তিকায় লিখিত “আল্লাহ ও মায়বুদ আল্লাহ’র” মায়রিফাত মুকাবিলায় আর এক মায়রিফাত লইয়া আসুন।
(৮) হাজরাত খালীফা সাঃ বলেনঃ- যে কোন পীরের নিকট বায়য়াত হলে তার নিম্নতম তিনটি দেহ এক সঙ্গে লঘু লঘু আলোকে আলোকিত হয়। পক্ষান্তুরে আমার নিকট বায়য়াত হলেই এক সাথে ৫২টি দেহ লঘু লঘু আলোকে আলোকিত হয়।
(৯) কুরআন যেমন হাজরাত মুহাম্মাদের সাঃ শ্রেষ্ঠতম মুয়জিজা ছিলেন, বীথিকাও তেমন হাজরাত খালীফার সাঃ শ্রেষ্ঠতম মুয়জিজা হইলেন।
(১০) রাসূল সাঃ চরিত্রে আল-আমীন ছিলেন, খালীফাও সাঃ চরিত্রে ঐ মহামানব আখ্যায়িত হইলেন।
(১১) হাজরাত মুহাম্মাদ সাঃ আল্লাহ’র ‘লুকাইয়া ধন’ এবং হাজরাত মুহাম্মাদ শামসজ্জুহা সাঃ আল্লাহ’র ‘লুকিয়া ধন’। হাজরাত মুহাম্মাদ সাঃ এবং হাজরাত মুহাম্মাদ শামসুজ্জুহার সাঃ পরস্পর সম্পর্ক যেন একই।
একাদশ খালীফার সাঃ মুরীদগণের বৈশিষ্ট্যঃ-
(১) হাজরাত মুহাম্মাদ সাঃ বলেন – আমার উম্মাত বৃষ্টির ধারার মত। প্রথম বৃষ্টির ধারা শ্রেষ্ঠ? না শেষ বৃষ্টির ধারা শ্রেষ্ঠ?  বুঝা যায় না (মিসকাত)। উক্ত হাদীস মর্মে প্রথমোক্ত বৃষ্টির ধারা হাজরাত মুহাম্মাদের সাঃ সাহাবীগণ এবং শেষ বৃষ্টির ধারা হলেন হাজরাত মুহাম্মাদ শামসুজ্জুহার সাঃ মুরীদগন। এ প্রসঙ্গে একাদশ খালীফা সাঃ বলেন – আমার মুরীদগণ আজব মুরীদ। তারা ঐ খুসুসিয়াতে বিভুষিত।
(২) হাজরাত মুহাম্মাদ সাঃ বলেন – ঈমানে আজব সৃষ্টি সেই দলটি, যে দলটি আমার পরে আসিবে। তাহারা পাইবে পাতা (সাহীফা) গুলি। তাহাতে থাকিবে লিখা (পান্ডুলিপি বা কিতাব), তাহাতে যা থাকিবে (যে সমস্ত বিষয়) তাহারা তাহার উপর ঈমান আনিবে (মিসকাত)। এই পান্ডুলিপি বা কিতাব মর্মে ‘বীথিকাপাক’ এবং আজব দলটি মর্মে একাদশ খালীফার সাঃ মুরীদগণ হইলেন।
একাদশ খালীফার সাঃ বিশেষ বিশেষ বাণীসমূহঃ-
(১) উলুল আজাম মুহাম্মাদ রাসূলের সাঃ মধ্যে আমিই তাঁর একমাত্র উলুল আজাম খালীফা। তাঁর পূর্ণ চরিত্রের বয়ান দেওয়াই আমার খিলাফাতের মূখ্যতম উদ্দ্যেশ্য। তা তাফসীলে পরিণত করাই আমার সৃষ্টির একমাত্র উদ্দেশ্য। “বীথিকাই” আমার সে তাফসীলী বয়ান।
(২) আমি একজন বাঙালী। আমার ভাষা বাংলা। ‘বীথিকা’ আমার বাংলা ভাষায়। এককালে রাষ্ট্রভাষা বাংলা হবে। বাংলাভাষা এককালে আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করবে।
বিঃদ্রঃ ১৯৯৯ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১শে ফেব্রুয়ারী আন্তর্যাতিক মর্যাদা লাভ করে। স্মর্তব্য যে, বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য দাবি জানানো হয়েছে। অচিরেই তাও বাস্তবায়িত হবে, ইন্‌শাআল্লাহ।
(৩) ঠাকুরগাঁও রোডের ভাগ্য সুপ্রসন্ন। আমার কারণে সে বারাকাতওয়ালী। আমার দোয়ায় সে নিরাপদ। ………আজ আপনারা দেখতেছেন ঠাকুরগাঁও রোডকে এই নিবিড় জঙ্গলাকীর্ণ ও হিংস্র পশু পাখিতে ভরপুর? ইহা একদিন কামিনী শহর হবে। আমার জন্মভূমি হবে ফুল শহর।
বিঃদ্রঃ স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে (১৯শে মে, ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে) পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী কর্তৃক খানকাহ শরীফ বাউন্ডারীর চতুর্দিকে ঘিরে দীর্ঘক্ষণ যাবৎ মেশিনগান সহ বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্রের গোলাবর্ষনের পরও বাউন্ডারীর সকল মানুষ সহ ঘরবাড়ী অক্ষত থাকা, খালীফাতুল্লাহর সাঃ বাণীর (ঠাকুরগাঁও রোডের) নিরাপত্তার বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ঠাকুরগাঁও রোডের নিম্ন আয়ের জনগণের আয়-রোজগার ও জীবনযাত্রার মান অন্যান্য এলাকার বিত্তশালী অপেক্ষাও উন্নততর হওয়ার (বারাকাতওয়ালীর) বিষয়টিও অনুরুপভাবে প্রমাণিত।
(৪) আমার মৃত্যুতে যদি তোমরা এক ফোঁটা চোখের জল ফেলতে পার তবে তাই তোমাদের জন্য সৌভাগ্য। ……..এমন সন্ধিক্ষণে আমার মৃত্যু হবে যে, তোমরা আমার জন্য কাঁদতে পারবে না, কাঁদবার সুযোগ পাবে না।
বিঃদ্রঃ পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক ঠাকুরগাঁও দখলের মাত্র কয়েক দিন পরেই ১৯৭১ সালের ১৯শে এপ্রিল একাদশ খালীফা সাঃ ওফাত করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিঊন। সেই সময় নিজের জীবন রক্ষার্থে জনগণ সশব্দে কাঁদাত দূরের কথা, উচ্চস্বরে কথা বলতে পারতনা।
(৫) আমাল? ঈমানে কয়জন টিকে থাকবে? আরে এখনো কি হয়েছে? আরো চাপের সৃষ্টি হবে। এমন যে, মুসলিম জগত ওতপ্রোত হয়ে যাবে। নাকের উপর পানিতে ডুবে থাকার মত মানুষের অবস্থা হবে। সাধারণ জনেরা কেন, রাষ্ট্রের নেতারা পর্যন্ত দিশেহারা হয়ে যাবে। সে সময় এক বিষয় হওয়ার কথা। সে সময় অকস্মাৎ মহাযুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার কথা।
(৬) আমার এ খিলাফাত বাউন্ডারী খারাপ হয়ে যাবে। আমাল? ঈমানে কয়জন টিকে থাকবে? কিন্তু জেনে রাখুন! আমার যদি একটি লোকও থাকে তবে আমি যা প্রতিষ্ঠা করেছি তা কেউ ধ্বংস করতে পারবে না। আমার খিলাফাত বাউন্ডারীকে নষ্ট করতে পারবে না।
(৭) আমি মুশরিককে, ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানকে ভয় করিনা। আমি ভয় করি ঐ ফাসিককে যে লেখাপড়ায়, সূরাতে ও লেবাসে পূর্ণ মুসলমান; একজন বড় আলীম; কিন্তু অন্তর ঘুণে খাওয়া ক্ষুদ্ধ ব্যাঘ্র – সংক্রামক রোগী।
বিঃদ্রঃ “এমন জামানা আসিবে – যখন লোকের জবান নাবীর মত, আর দিল ব্যাঘ্রের মত হইবে” – হাদীসটি বর্তমান জামানায়  বিশেষভাবে প্রাধ্যাণ্য যোগ্য।
(৮) একাদশ খালীফা সাঃ তাঁর ওফাতের যথাদিন পূর্বে তাঁর সহধর্মিনীকে বলেন – আমার মৃত্যুর পর যদি পাঁচ বছর টিকলে, তবে বুঝবে তুমি আরো কিছুদিন বাঁচবে। নচেৎ পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই তুমিও দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে যাবে।
বিঃদ্রঃ হাজরাত মা রাহীমা আঃ (একাদশ খালীফার সাঃ সহধর্মিনী) বাংলা ১৩৮৩ সালের ৪ঠা বৈশাখ (পাঁচ বছর পূর্তি না হতেই) ওফাত করেন।
(৯) আপনাদের কিছুই করতে হবেনা। আপনারা শুধু লাঠি ধরে থাকেন। ডিউটি করেন। আমার আদেশ নিষেধ মান্য করে চলেন। আল্লাহর আরো লোক আছে। তারাই করবে আমার কাজ। যাদেরকে হয়ত আজ আমরা দেখছিনা, যারা আজ আমাদের বিরোধিতা করছে তারাই হয়ত একদিন আমাদের কাজ করছে, দেখতে পাবেন। …………আপনারা শারীয়াত মেনে চলেন। আমার আদেশ নিষেধও মান্য করে চলেন। আমাকে ডিউটি প্রহরা করেন। এতেই অভীষ্ঠ সিদ্ধি লাভ করবেন। আমার জন্য এক ঘন্টা ডিউটি করা সত্তর বছর নাফল ইবাদাত অপেক্ষাও অধিক। আমার ব্যাপার সম্পূর্ণ ভিন্ন। কর্মক্ষেত্রও আমার সম্পূর্ণ অন্য। ……..এ খিলাফাত সহজ নয়। খুব ভারী।
একাদশ খালীফার সাঃ নাশীহাত সমূহঃ-
(১) একাদশ খালীফা সাঃ বলেন – যে কোন নাবী, রাসূল ও পীরকে দেখলে আল্লাহর স্মরণ হয়। আল্লাহর জিক্‌র হয়। হেতু তাঁহাদেরকে দেখার অর্থ আল্লাহকেই দেখা হয়। নাবী, রাসূল ও পীরের উপর হাত রেখে বায়াত হলে আল্লাহ ও রাসূলের সাঃ হাতেই বায়াত হওয়া হয়। আপনারা আমার মুরীদ। অতএব এ গুমরাহী যুগে যতই ঝন্‌ঝাবায়ু আসুক না কেন? আপনারা বায়াত ছিন্ন করবেন না। আল্লাহর রজ্জু সুদৃঢ় করে রইবেন। এই যে – “তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ় ধারণ কর” অবতীর্ণ আছেন, তদমর্মে নিজেদের পীরকেও ধারণ করা মুরাদ হল।
(২) একাদশ খালীফা সাঃ বলেন – আমার মুরীদগণের জন্য আমার জীবমানে নাফসে ফানা হওয়া শর্ত। হাজরাত হাবীব রাসূলের সাঃ উম্মাতগণের জন্যও তা শর্ত ছিল। সাবধান! প্রথম সুলতান জীবমানেও তাই শর্ত।
(৩) একাদশ খালীফা সাঃ তাঁর প্রায় নাশীহাতেই সুন্নী জামায়াতে দৃঢ় থাকার ও রাজনীতি না করার তাকিদ কহেন। মাওলানা মাওদুদীর পথে শামীল হওয়া হারাম কহেন।
(৪) খালীফা সাঃ বলেন – আমার উপদেশ যে আপনারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্‌ সাঃ” উপর দৃঢ় ঈমান রাখবেন। নামাজ কায়িম করবেন। বান্দার হাক্‌ দুনিয়াতেই আদায় করবেন। বড়কে সম্মান ও ছোটকে স্নেহ করবেন । বান্দার হাক্‌ মধ্যে আমানাত-খিয়ানাত ও পিতৃক মার্তৃক সম্পর্ক (রেহেম) ছিন্ন অত্যন্ত কঠিন। দোজখ ব্যতীত এর ক্ষমা নাই।
            উদ্ধৃত হাদীস সমূহ, জ্ঞানীগুণী জনের ভবিষ্যৎবাণী, তাঁর ঘোষণা, জীবমানে তাঁর কার্যকলাপ, বাণী, নাশীহাত সমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, হাজরাত মুহাম্মাদ শামসুজ্জুহা  সাঃ তাঁর একাদশ খিলাফাত দাবীর ক্ষেত্রে ইসলামী শরা-শারীয়াত, বিধি-বিধান পরিপন্থী কোনো কিছুই পরিলক্ষিত হয় নি। তাই আমিও দৃঢ় কন্ঠে বলছি যে, হাজরাত মুহাম্মাদ শামসুজ্জুহা সাঃ বারহাক একাদশ খালীফা। উক্ত বিষয়ে নিম্ন উদ্ধৃত অংশে মনোনিবেশ করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি :-
            হাজরাত একাদশ খালীফা সাঃ তাঁর সারাটি জীবনে বহু কিছু বলে গেছেন যার প্রত্যেকটি আজ অক্ষরে অক্ষরে পোহায় যাচ্ছে। আশা করি অবশিষ্টগুলিও পোহায় যাবে ইন্‌শাআল্লাহ্‌ আমার পীর কিবলার আঃ ওয়াসিলায়। তবে আমরা মুরীদগণ তাঁর কথায় ও কাজে যা বুঝতাম ও ভাবতাম, তা কিন্তু তেমনভাবে হতনা। একদা তিঁনি তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় পুত্রকে বললেন – তোমরা কি করতেছরে? তোমরা যে কি চিন্তা করতেছ, কি ভাবতেছ, তার একটাও হবে না রে, একটাও হবে না। আল্লাহ যে কোন কল কোন দিক দিয়ে ঘুরাচ্ছেন, তা কে বলবেন? তা আল্লাহ’ই জানেন। আল্লাহ’ই বুঝেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ’ই আলীম, আল্লাহ’ই হাকীম। আমরা অদূরদর্শী। পরিণামদর্শী জনই কিন্তু মুবারক লোক।
            অবলম্বনেঃ
                        (১) মানব জীবন;
                        (২) খিলাফাত সত্যতার দালীল;
                        (৩) জীবন কথা – হাজরাত মুহাম্মাদ শামসুজ্জুহা সাঃ;
                        (৪) দর্পণ।

Wednesday, January 16, 2019

প্রাকৃতিক প্রয়োজন শিষ্টাচার

ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
মানুষের পানাহারের প্রয়োজন যেমন আছে তেমনি তার পেশাব-পায়খানা বা প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারারও যরূরত রয়েছে। এক্ষেত্রে মুমিন অবশ্যই কিছু আদব-কায়েদা বা শিষ্টাচার মেনে চলবে। কেননা সে অন্য জাতি-ধর্মের মানুষের মত যেখানে-সেখানে এ প্রয়োজন মিটাতে পারে না। আবার ইসলামের নির্দেশনার বাইরেও এসব কাজ সম্পাদন করতে পারে না। বরং এসব ক্ষেত্রে ইসলামে যেসব আদব বা শিষ্টাচার রয়েছে, তা মেনে চলা প্রত্যেক মুমিনের জন্য কর্তব্য। নিম্নে এ সম্পর্কিত শিষ্টাচার সমূহ উল্লেখ করা হ’ল।-
১. প্রাকৃতিক প্রয়োজন শীঘ্রই সম্পন্ন করা : পেশাব-পায়খানার বেগ অনুভূত হ’লেই তা দ্রুত সম্পন্ন করা উচিত। কেননা এতে দ্বীনী ও শারীরিক উপকারিতা রয়েছে। এমনকি রাসূল (ছাঃ) এ অবস্থায় ছালাত আদায় করতেও নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন,لاَ صَلاَةَ بِحَضْرَةِ الطَّعَامِ وَلاَ وَهُوَ يُدَافِعُهُ الأَخْبَثَانِ- ‘খাদ্য উপস্থিত হ’লে ছালাত নেই এবং পেশাব-পায়খানার চাপ থাকলে কোন ছালাত নেই’।[1] তবে এমতাবস্থায় ছালাত আদায় করলে তা বাতিল হবে না।
২. লোকচক্ষুর অন্তরালে পেশাব-পায়খানা করা : পেশাব-পায়খানা খোলা স্থানে করা হ’লে দূরে যেতে হবে, যাতে লোক থেকে আড়াল হয়। মুগীরাহ বিন শু‘বা (রাঃ) বলেন, كَانَ إِذَا ذَهَبَ الْمَذْهَبَ أَبْعَدَ ‘নবী করীম (ছাঃ) প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারতে দূরবর্তী স্থানে যেতেন’।[2] এ হাদীছে দূরে যাওয়ার উদ্দেশ্য হ’ল, মানুষ থেকে আড়াল করা, যাতে তাদের সামনে লজ্জাস্থান প্রকাশিত হয়ে না পড়ে। সুতরাং চারিদিকে ঘেরা স্থান হ’লে দূরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।[3]
৩. যমীনের নিকটবর্তী হওয়ার পূর্বে কাপড় না খোলা : প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ করার ক্ষেত্রে যদি খোলা স্থানে হয়, তাহ’লে লজ্জাস্থান উন্মুক্ত হওয়া থেকে বেঁচে থাকার জন্য যমীনের নিকটবর্তী হওয়ার পূর্বে কাপড় উঠাতে নিষেধ করা হয়েছে।[4] আনাস (রাঃ) বলেন,كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَرَادَ الْحَاجَةَ لَمْ يَرْفَعْ ثَوْبَهُ حَتَّى يَدْنُوَ مِنْ الْأَرْضِ- ‘নবী করীম (ছাঃ) যখন মলত্যাগ করার প্রয়োজন মনে করতেন, তখন তিনি মাটির কাছাকাছি না হওয়া পর্যন্ত কাপড় তুলতেন না’।[5] এ হাদীছের ব্যাখ্যায় ইমাম তীবী বলেন, খোলা ময়দান এবং ঘরের ভিতরে উভয় ক্ষেত্রে যরূরী প্রয়োজন ব্যতীত যমীনের নিকটবর্তী না হয়ে কাপড় খোলা বৈধ নয়। তবে হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, সকলের ঐক্যমতে নির্জন স্থানে কাপড় খোলাতে কোন সমস্যা নেই।[6]
৪. তিনটি স্থানে পেশাব-পায়খানা করা থেকে বিরত থাকা : পেশাব-পায়খানা নির্দিষ্ট স্থানে করতে হবে। যরূরী প্রয়োজনে অন্যত্র করতে হ’লে মানুষের চলাচলের রাস্তা, ছায়াযুক্ত স্থান ও পানি নেওয়ার স্থানে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারা থেকে বিরত থাকতে হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,اتَّقُوا الْمَلَاعِنَ الثَّلَاثَ: الْبَرَازَ فِي الْمَوَارِدِ، وَالظِّلِّ، وَقَارِعَةِ الطَّرِقِ- ‘তোমরা তিনটি অভিশপ্ত জিনিস থেকে দূরে থাক- ব্যবহার্য পানি বা পানির উৎসে, ছায়াদার বৃক্ষতলে ও লোক চলাচলের পথে (পেশাব-পায়খানা করা থেকে)’।[7] অন্যত্র তিনি বলেন,اتَّقُوا اللاَّعِنَيْنِ. قَالُوْا وَمَا اللاَّعِنَانِ يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ  الَّذِىْ يَتَخَلَّى فِىْ طَرِيْقِ النَّاسِ أَوْ ظِلِّهِمْ ‘তোমরা দু’টি অভিশপ্ত কাজ থেকে দূরে থাকবে। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, অভিশপ্ত কাজ দু’টি কি হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)? তিনি বললেন, মানুষের যাতায়াতের পথে অথবা (বিশ্রাম নেওয়ার) ছায়া বিশিষ্ট জায়গায় পেশাব-পায়খানা করা’।[8]
৫. পেশাব-পায়খানারত অবস্থায় যিকর ও তাসবীহ না করা : পেশাব-পায়খানারত অবস্থায় কুরআন তেলাওয়াত, যিকর ও তাসবীহ পাঠ করা যাবে না। কেননা এটা অপবিত্রতা হ’তে পবিত্র হওয়ার একটি মুহূর্ত। আর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা, যিকর, তাসবীহ ও তেলাওয়াত পবিত্রাবস্থায় হওয়া বাঞ্ছনীয়। মল-মূত্র ত্যাগ করা অবস্থায় এসব কাজ করলে তাতে এই কাজগুলোকে হীন করা হয়। আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন,مَرَّ رَجُلٌ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ يَبُوْلُ فَسَلَّمَ عَلَيْهِ، فَلَمْ يَرُدَّ عَلَيْهِ السَّلَامَ ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পেশাব করছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি তাঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সে তাঁকে সালাম দিল। কিন্তু তিনি তার সালামের জবাব দিলেন না’।[9]
অন্য বর্ণনায় এসেছে, জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিল। তিনি তখন পেশাবরত ছিলেন। সে তাঁকে সালাম দিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে বললেন,إِذَا رَأَيْتَنِي عَلَى مِثْلِ هَذِهِ الْحَالَةِ، فَلَا تُسَلِّمْ عَلَيَّ، فَإِنَّكَ إِنْ فَعَلْتَ ذَلِكَ لَمْ أَرُدَّ عَلَيْكَ، ‘তুমি আমাকে এ অবস্থায় দেখতে পেলে আমাকে সালাম দিবে না। কারণ তুমি তা করলে আমি তোমার সালামের উত্তর দিতে পারব না’।[10]
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পেশাব-পায়খানারত অবস্থায় সালাম দিতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং এ হাদীছ প্রমাণ করে যে, প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ করা অবস্থায় আল্লাহর যিকর, আযানের উত্তর দেওয়া, হাঁচির জবাব দেওয়া, কুরআন তেলাওয়াত করা এবং অন্যান্য তাসবীহ-তাহলীল করা বৈধ নয়।
উল্লেখ্য, পেশাব-পায়খানা করা অবস্থায় কেউ সালাম দিলে প্রয়োজন সেরে উত্তর দেওয়া উচিত। এ মর্মে হাদীছে এসেছে, আল-মুহাজির ইবনু কুনফুয (রাঃ) হ’তে বর্ণিত,
أَنَّهُ أَتَى النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ يَبُولُ فَسَلَّمَ عَلَيْهِ فَلَمْ يَرُدَّ عَلَيْهِ حَتَّى تَوَضَّأَ ثُمَّ اعْتَذَرَ إِلَيْهِ فَقَالَ إِنِّى كَرِهْتُ أَنْ أَذْكُرَ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ إِلاَّ عَلَى طُهْرٍ. أَوْ قَالَ عَلَى طَهَارَةٍ.
‘একদা তিনি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট গিয়ে তাঁকে সালাম দিলেন। তখন নবী করীম (ছাঃ) পেশাব করছিলেন। সেজন্য অযূ না করা পর্যন্ত তিনি তার জবাব দিলেন না। অতঃপর (পেশাব শেষে অযূ করে) তিনি তার নিকট ওযর পেশ করে বললেন, পবিত্রতা ছাড়া আল্লাহর নাম স্মরণ করা আমি অপসন্দ করি’।[11] অন্য বর্ণনায় এসেছে, নবী করীম (ছাঃ) ওযূ না করে সালামের উত্তর দিলেন না।[12]
৬. ক্বিবলার দিকে ফিরে পেশাব-পায়খানা না করা : ক্বিবলার দিকে ফিরে পেশাব-পায়খানা করা উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِذَا أَتَيْتُمُ الْغَائِطَ فَلَا تَسْتَقْبِلُوا الْقِبْلَةَ وَلَا تَسْتَدْبِرُوهَا وَلَكِنْ شَرِّقُوا أَوْ غَرِّبُوا- ‘তোমরা পায়খানা বা পেশাব করতে ক্বিবলামুখী হবে না, বরং তোমরা (উত্তর অঞ্চলের অধিবাসীরা) পূর্বদিকে কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ ফিরাবে’। আবূ আইয়ূব আনছারী (রাঃ) বলেন, আমরা যখন সিরিয়ায় এলাম তখন পায়খানাগুলো ক্বিবলামুখী বানানো পেলাম। আমরা কিছুটা ঘুরে বসতাম এবং আল্লাহ তা‘আলার নিকট তওবা-ইস্তিগফার করতাম।[13]
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরো বলেন, ‘তোমাদের কেউ পেশাব-পায়খানা করতে বসলে কখনো যেন সে ক্বিবলার দিকে মুখ করে এবং সেদিকে পিছন দিয়েও না বসে’।[14]
৭. বদ্ধ পানিতে পেশাব না করা : প্রবাহিত পানি ব্যতীত পুকুর, লেক, হাউজ ইত্যাদির মত বদ্ধ পানিতে পেশাব করা নিষেধ। রাসূল (ছাঃ) বলেন,لَا يَبُولَنَّ أَحَدُكُمْ فِي الْمَاءِ الدَّائِمِ الَّذِيْ لَا يَجْرِيْ ثُمَّ يَغْتَسِلُ فِيْهِ- ‘তোমাদের কেউ যেন স্থির- যা প্রবাহিত নয় এমন পানিতে কখনো পেশাব না করে। অতঃপর সে আবার তাতে গোসল করবে’।[15] অর্থাৎ বাধ্যগত অবস্থা ব্যতিরেকে বদ্ধ পানিতে পেশাব করা নিষেধ। আর পেশাব করলে সাথে সাথেই সেই পানি ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে।[16] এ বিধান অল্প পানির ক্ষেত্রে হারাম এবং অধিক পানির ক্ষেত্রে মাকরূহ।[17]
৮. স্বাভাবিক অবস্থায় বসে পেশাব করা : কোন ওযর না থাকলে বসেই পেশাব করতে হবে। এটাই হচ্ছে পেশাব করার স্বাভাবিক আদব। আয়েশা (রাঃ) বলেন,مَنْ حَدَّثَكُمْ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَالَ قَائِمًا فَلَا تُصَدِّقُوْهُ مَا كَانَ يَبُوْلُ إِلَّا جَالِسًا- ‘যে ব্যক্তি তোমাদের বলে যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দাঁড়িয়ে পেশাব করেছেন, তোমরা তার কথা বিশ্বাস করবে না। (কেননা) তিনি বসেই পেশাব করতেন’।[18]
যদি কোথাও বসে পেশাব করার ক্ষেত্রে শরীর বা কাপড় অপবিত্র হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অথবা বসার মত পরিবেশ না থাকে তাহ’লে সেখানে দাঁড়িয়ে পেশাব করা যায়। হুযায়ফাহ (রাঃ) বলেন,كُنْتُ مَعَ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم فَانْتَهَى إِلَى سُبَاطَةِ قَوْمٍ، فَبَالَ قَائِمًا فَتَنَحَّيْتُ فَقَالَ ادْنُهْ. فَدَنَوْتُ حَتَّى قُمْتُ عِنْدَ عَقِبَيْهِ فَتَوَضَّأَ فَمَسَحَ عَلَى خُفَّيْهِ- ‘আমি (কোন এক সফরে) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি কোন এক সম্প্রদায়ের ময়লা-আবর্জনা ফেলার জায়গায় এসে পেঁŠছলেন। অতঃপর সেখানে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করলেন, ‘আমি তখন দূরে সরে গেলাম। তিনি বললেন, কাছে এসো। আমি তার নিকটে গেলাম এমনকি একেবারে তার পিছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তিনি ওযূ করলেন। অতঃপর তাঁর উভয় মোযার উপর মাসাহ করলেন’।[19]
৯. পেশাবের ছিঁটা থেকে সাবধান থাকা : নরম মাটিতে পেশাব করা, যাতে পেশাবের ছিঁটা কাপড়ে বা শরীরে না লাগে। অনেক সময় শক্ত মাটিতে পেশাব করলে তার ছিটা এসে শরীরে বা কাপড়ে লাগে। ফলে কাপড় ও শরীর অপবিত্র হয়ে যায়। এ অবস্থায় ছালাত আদায় করা হ’লে তা কবুল হবে না। রাসূল (ছাঃ) বলেন,اِسْتَنْزِهُوْا مِنَ الْبَوْلِ، فَإِنَّ عَامَّةَ عَذَابِ الْقَبْرِ مِنْهُ- ‘তোমরা পেশাব থেকে সতর্কতা অবলম্বন কর। কেননা অধিকাংশ কবরের আযাব এর কারণেই হয়ে থাকে’।[20]
১০. পেশাব-পায়খানার সময় কথা না বলা : পেশাব-পায়খানায় বসে কথা বলা সমীচীন নয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন,لَا يَقْعُدِ الرَّجُلَانِ عَلَى الْغَائِطِ يَتَحَدَّثَانِ يَرَى كُلُّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا عَوْرَةَ صَاحِبِهِ فَإِنَّ اللهَ يَمْقُتُ عَلَى ذَلِكَ- ‘দুই ব্যক্তি যেন একই সঙ্গে পেশাব-পায়খানার জন্য না বসে এবং একে অপরের লজ্জাস্থানের দিকে তাকিয়ে পরস্পরে কথাবার্তা বলতে না থাকে। কারণ এরূপ কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন’।[21] তবে যরূরী প্রয়োজনে কথা বলা যেতে পারে।
১১. আল্লাহর নাম সম্বলিত কোন কিছু নিয়ে পেশাব-পায়খানায় প্রবেশ না করা : আল্লাহর নাম সম্বলিত কোন কিছু বা কুরআনের আয়াত সম্বলিত কোন কিছু নিয়ে পেশাব-পায়খানায় প্রবেশ করা উচিত নয়। আল্লাহ বলেন,وَمَنْ يُعَظِّمْ حُرُمَاتِ اللهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَهُ عِنْدَ رَبِّهِ، ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকৃত হারাম সমূহকে সম্মান করবে, সেটি তার প্রতিপালকের নিকট তার জন্য উত্তম হবে’ (হজ্জ ২২/৩০)। তিনি আরো বলেন,وَمَنْ يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوَى الْقُلُوْبِ، ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ সমূহকে সম্মান করে, নিশ্চয়ই সেটি হৃদয় নিঃসৃত আল্লাহভীতির প্রকাশ’ (হজ্জ ২২/৩২)
১২. গর্তে পেশাব-পায়খানা না করা : গর্তে পেশাব-পায়খানা করতে রাসূল (ছাঃ) নিষেধ করেছেন। তাই এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা যরূরী। আব্দুল্লাহ ইবনু সারজিস (রাঃ) বলেন,أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم نَهَى أَنْ يُبَالَ فِى الْجُحْرِ. قَالَ قَالُوا لِقَتَادَةَ مَا يُكْرَهُ مِنَ الْبَوْلِ فِى الْجُحْرِ قَالَ كَانَ يُقَالُ إِنَّهَا مَسَاكِنُ الْجِنِّ. ‘আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) গর্তে পেশাব করতে নিষেধ করেছেন। লোকজন কাতাদাকে জিজ্ঞেস করল, গর্তে পেশাব করা কেন অপসন্দনীয়? তিনি বললেন, বলা হয়, এতে জিনেরা বসবাস করে’।[22]
১৩. গোসলখানায় পেশাব-পায়খানা না করা : গোসলখানায় পেশাব করতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা এতে মনে শয়তানী ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি হয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন,لَا يَبُولَنَّ أَحَدُكُمْ فِي مُسْتَحَمِّهِ، فَإِنَّ عَامَّةَ الْوَسْوَاسِ مِنْهُ، ‘তোমাদের কেউ যেন তার গোসলখানায় পেশাব না করে। কেননা তা থেকেই যাবতীয় সন্দেহের উদ্রেক হয়’।[23]
১৪. অসুস্থ বা অন্য কোন বাধ্যগত কারণে পাত্রে পেশাব করা : অসুস্থ বা অন্য কোন বাধ্যগত কারণে পাত্রে পেশাব করা যায়। উমায়মা বিনতু রুকায়কা (রাঃ) বলেন,كَانَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدَحٌ مِنْ عَيْدَانٍ يَبُوْلُ فِيْهِ وَيَضَعُهُ تَحْتَ السَّرِيْرِ، ‘নবী করীম (ছাঃ)-এর একটি কাঠের পেয়ালা ছিল। তিনি তাতে (রাত্রে) পেশাব করতেন এবং তা খাটের নিচে রেখে দিতেন’।[24]
১৫. পেশাব-পায়খানায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বাম পা ও বের হওয়ার সময় ডান পা আগে রাখা : পেশাব-পায়খানায় প্রবেশের সময় বাম পা ও বের হওয়ার সময় ডান পা আগে রাখা উত্তম।[25]
১৬. পেশাব-পায়খানায় প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় দো‘আ পড়া : শৌচাগারে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় দো‘আ পড়া সুন্নাত। আনাস (রাঃ) বলেন,كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ الْخَلَاءَ قَالَ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ ‘নবী করীম (ছাঃ) যখন শৌচাগারে যেতেন তখন বলতেন, হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে পুরুষ ও স্ত্রী জিন শয়তানের ক্ষতি হ’তে আশ্রয় চাচ্ছি।[26] আয়েশা (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) যখন পায়খানা থেকে বের হ’তেন, তখন বলতেন, غُفْرَانَكَ ‘গুফরানাকা’ অর্থ- হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট ক্ষমা চাই।[27]
রাসূল (ছাঃ) বলেন,إِنَّ هَذِهِ الْحُشُوشَ مُحْتَضَرَةٌ، فَإِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَقُلْ: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ الْخُبُثِ وَالخَبَائِثِ ‘(পায়খানায়) এসব শয়তান উপস্থিত হয়। অতএব তোমাদের কেউ (পায়খানায়) প্রবেশকালে যেন বলে, হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট পুরুষ ও স্ত্রী জিন শয়তানের ক্ষতি থেকে আশ্রয় চাচ্ছি’।[28]
১৭. পায়খানা থেকে বের হওয়ার পর হাত ধৌত করা : পায়খানা থেকে বের হয়ে হাত ধৌত করা উত্তম। বিশেষত বাম হাত মাটি বা সাবান দিয়ে ধুয়ে পরিস্কার করতে হবে, যাতে কোন রোগজীবাণু হাতে লেগে না থাকে। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন,أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَضَى حَاجَتَهُ، ثُمَّ اسْتَنْجَى مِنْ تَوْرٍ، ثُمَّ دَلَكَ يَدَهُ بِالْأَرْضِ. ‘নবী করীম (ছাঃ) পায়খানা করার পর বদনার পানি দিয়ে শৌচকার্য সম্পন্ন করতেন, অতঃপর তাঁর হাত মাটিতে ঘষতেন’।[29]
১৮. পেশাব-পায়খানায় গমনকালে এদিক-সেদিক না তাকানো : প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারার জন্য খোলা ময়দানে বা দূরের পায়খানায় গমনকালে এদিক-সেদিকে না তাকানো উচিত। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন,اتَّبَعْتُ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم  وَخَرَجَ لِحَاجَتِهِ، فَكَانَ لاَ يَلْتَفِتُ، ‘যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বের হ’তেন তখন আমি তাঁর অনুসরণ করতাম। তাঁর অভ্যাস ছিল যে, এ সময় তিনি এদিক-সেদিক তাকাতেন না’।[30]
১৯. ইস্তেঞ্জার সময় ডান হাত ব্যবহার না করা : বাধ্যগত অবস্থা ব্যতীত শৌচকার্যে ডান হাত ব্যবহার করা যাবে না। বরং বাম হাত ব্যবহার করতে হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,لاَ يُمْسِكَنَّ أَحَدُكُمْ ذَكَرَهُ بِيَمِينِهِ وَهُوَ يَبُولُ وَلاَ يَتَمَسَّحْ مِنَ الْخَلاَءِ بِيَمِينِهِ وَلاَ يَتَنَفَّسْ فِى الإِنَاءِ- ‘তোমাদের কেউ যেন পেশাব করার সময় তার পুরুষাঙ্গ ডান হাত দিয়ে না ধরে এবং পায়খানার পর ডান হাত দিয়ে যেন ইস্তিঞ্জা (কুলুখ ব্যবহার) না করে এবং (পানি পান করার সময়) পাত্রের মধ্যে নিঃশ্বাস না ফেলে’।[31] তিনি আরো বলেন,إِذَا اسْتَطَابَ أَحَدُكُمْ، فَلَا يَسْتَطِبْ بِيَمِينِهِ، لِيَسْتَنْجِ بِشِمَالِهِ ‘তোমাদের কেউ যেন তার ডান হাতে শৌচকার্য না করে, বরং সে যেন তার বাম হাতে শৌচকার্য করে’।[32]
হাফছাহ (রাঃ) বলেন,أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَجْعَلُ يَمِينَهُ لأَكْلِهِ وَشُرْبِهِ، وَوُضُوئِهِ وَثِيَابِهِ، وَأَخْذِهِ وَعَطَائِهِ، وَيَجْعَلُ شِمَالَهُ لِمَا سِوَى ذَلِكَ ‘নবী করীম (ছাঃ) স্বীয় ডান হাত পানাহার, ওযূ, কাপড় পরিধান এবং (কোন কিছু) আদান-প্রদানের জন্য ব্যবহার করতেন। আর এসব ব্যতীত অন্যান্য কাজে বাম হাত ব্যবহার করতেন’।[33]
২০. কুলুপের ক্ষেত্রে হাড্ডি ও গোবর ব্যবহার না করা : হাড় ও গোবর দ্বারা ইস্তিঞ্জা করতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ এগুলো জিনদের খাদ্য।[34] সালমান (রাঃ) বলেন যে, তাকে বলা হ’ল,
لَقَدْ عَلَّمَكُمْ نَبِيُّكُمْ كُلَّ شَيْءٍ حَتَّى الْخِرَاءَةَ، قَالَ: أَجَلْ لَقَدْ نَهَانَا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نَسْتَقْبِلَ الْقِبْلَةَ بِغَائِطٍ أَوْ بَوْلٍ، وَأَنْ لَا نَسْتَنْجِيَ بِالْيَمِينِ، وَأَنْ لَا يَسْتَنْجِيَ أَحَدُنَا بِأَقَلَّ مِنْ ثَلَاثَةِ أَحْجَارٍ، أَوْ نَسْتَنْجِيَ بِرَجِيعٍ أَوْ عَظْمٍ-
‘তোমাদের নবী তোমাদেরকে সবকিছুই শিক্ষা দিয়েছেন, এমনকি পায়খানা করার নিয়মও। সালমান (রাঃ) বললেন, হ্যঁা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে ক্বিবলামুখী হয়ে পেশাব-পায়খানা করতে, ডান হাতে শৌচকার্য করতে, শৌচকার্যে আমাদের কারো তিনটি ঢিলার কম ব্যবহার করতে এবং গোবর অথবা হাড্ডি দ্বারা শৌচকার্য করতে নিষেধ করেছেন’।[35]
২১. বেজোড় সংখ্যক ঢিলা ব্যবহার করা : ঢিলা দিয়ে ইস্তেঞ্জা করার ক্ষেত্রে বেজোড় সংখ্যক ঢিলা ব্যবহার করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَنْ تَوَضَّأَ فَلْيَسْتَنْثِرْ وَمَنِ اسْتَجْمَرَ فَلْيُوتِرْ، ‘যে ব্যক্তি ওযূ করে সে যেন নাকে পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করে। আর যে শৌচকার্য করে সে যেন বেজোড় সংখ্যক ঢিলা ব্যবহার করে’।[36]
২২. ঢিলা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনটির কম ব্যবহার না করা : পানি না পাওয়া গেলে বা পানি ব্যবহারে কোন সমস্যা থাকলে ঢিলা দিয়ে শৌচকার্য সম্পন্ন করতে হয়। এক্ষেত্রে কমপক্ষে তিনটি ঢিলা ব্যবহার করতে হবে।[37]
২৩. ইস্তেঞ্জায় সম্মানিত জিনিস ব্যবহার না করা : পবিত্র কুরআন, হাদীছ বা তাফসীরের ছিন্নপত্র বা এ ধরনের কিছু শৌচকার্যে ব্যবহার করা যাবে না। কারণ এগুলি সম্মানীয়, যা হীন কাজে ব্যবহার করা সমীচীন নয়।
২৪. ইস্তেঞ্জায় পবিত্র পানি ব্যবহার করা : ইস্তেঞ্জায় পবিত্র পানি ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ যে পানির স্বাদ, গন্ধ বা রঙ পরিবর্তন হয়ে গেছে এমন পানি ইস্তিঞ্জায় ব্যবহার করা যাবে না। ইস্তিঞ্জায় পানি ও ঢিলা একত্রে ব্যবহার করা সুন্নাত নয়। কেননা এমর্মে বর্ণিত হাদীছ ছহীহ নয়।[38]
২৫. বায়ু নির্গত হওয়ার কারণে ইস্তেঞ্জা করা সমীচীন নয় : কেবল বায়ু নির্গত হওয়ার জন্য শৌচকার্য করার দরকার নেই। কেউ যদি এটাকে ছওয়াবের কারণ মনে করে তাহ’লে তা বিদ‘আত হবে।
পরিশেষে বলব, প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের আবশ্যিক কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রেও ইসলামী আদব বা শিষ্টাচার মেনে চলা যরূরী। এর মাধ্যমে ইহকালে যথাযথ পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা অর্জিত হবে এবং পরকালীন জীবনে অশেষ ছওয়াব ও নাজাত লাভ করা যাবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামী আদব বা শিষ্টাচার মেনে চলার তাওফীক দান করুন-আমীন!

[1]. বুখারী, মুসলিম হা/১২৭৪; আবূদাউদ হা/৮৯; মিশকাত হা/১০৫৭
[2]আবূদাউদ হা/১; নাসাঈ হা/১৭ ‘পায়খানা-পেশাব করতে দূরে যাওয়া’ অনুচ্ছেদ; ছহীহাহ হা/১১৫৯; মিশকাত হা/২২৫৮
[3]ওবায়দুল্লাহ মুবারাকপুরী, মির‘আতুল মাফাতীহ, ২/৫৬ পৃঃ।
[4]ঐ, ২/৫৬ পৃঃ।
[5]. আবূদাউদ হা/১১ ‘মলত্যাগ বা পেশাবের সময় গোপনীয়তা (পর্দা) অবলম্বন করা’ অনুচ্ছেদ; তিরমিযী হা/১৪; ছহীহাহ হা/১০৭১; মিশকাত হা/৩৪৬।
[6]. মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী, মিরকাতুল মাফাতীহ, ১/৩৮০ পৃঃ।
[7]ইবনু মাজাহ হা/৩২৮, ‘যাতায়াতের রাস্তায় পেশাব-পায়খানা করা নিষেধ’ অনুচ্ছেদ; ইরওয়া হা/৬২; মিশকাত হা/৩৫৫; ছহীহুল জামে হা/১১২, সনদ হাসান।
[8]মুসলিম, ‘পবিত্রতা’ অধ্যায়, ‘চলাচলের পথে ও ছায়ায় পেশাব পায়খানা করা নিষেধ’ অনুচ্ছেদ; আবূদাউদ হা/২৫, ‘নবী করীম (ছাঃ) যেসব জায়গায় পেশাব করতে নিষেধ করেছেন’ অনুচ্ছেদ
[9]. নাসাঈ হা/৩৭; ইবনু মাজাহ হা/৩৫৩, হাসান ছহীহ।
[10]ইবনু মাজাহ হা/৩৫২, পেশাবরত ব্যক্তিকে সালাম দেয়া প্রসঙ্গে’ অনুচ্ছেদ; ছহীহাহ হা/১৯৭।
[11]. আবূদাঊদ হা/১৭ ‘পেশাবরত অবস্থায় সালামের জবাব দেয়া’ অনুচ্ছেদ; মিশকাত হা/৪৬৭; ছহীহাহ হা/৮৩৪।
[12]. নাসাঈ হা/৩৮ ‘পবিত্রতা’ অধ্যায়, ‘ওযূর পর সালামের জবাব দেয়া’ অনুচ্ছেদ; ইবনু মাজাহ হা/৩৫০ ‘পবিত্রতা’ অধ্যায়, ‘পেশাবরত ব্যক্তিকে সালাম দেয়া’ অনুচ্ছেদ।
[13]বুখারী হা/৩৯৪; মুসলিম হা/৬৩২; মিশকাত হা/৩৩৪।
[14]. মুসলিম হা/৫০৩; ছহীহাহ হা/১৩০১।
[15]বুখারী হা/২৩৯ ‘আবদ্ধ পানিতে পেশাব করা’ অনুচ্ছেদ; মুসলিম হা/৬৮২; মিশকাত হা/৪৭৪।
[16]মির‘আত ২/১৬৯ পৃঃ।
[17]. সুবুলুস সালাম ১/২৭ পৃঃ।
[18]নাসাঈ হা/২৯; ইবনু মাজাহ হা/৩০৭; ছহীহাহ হা/২০১।
[19]. মুসলিম হা/৫১২ মোযার উপর মাসাহ করা অনুচ্ছেদ।
[20]. দারাকুতনী হা/৪০৪; বুলূগুল মারাম হা/১০২; ইরওয়া হা/২৮০, সনদ ছহীহ।
[21]আবূদাউদ হা/১৫; ছহীহাহ হা/৩১২০; তারাজু‘আত হা/১৪১৯।
[22]. আবূদাউদ হা/২৯, ‘গর্তে পেশাব করা নিষেধ প্রসঙ্গে’ অনুচ্ছেদ, সনদ ছহীহ।
[23]. বুখারী হা/৪৮৪২; ইবনু মাজাহ হা/৩০৪, ‘গোসলখানায় পেশাব করা মাকরূহ অনুচ্ছেদ; তিরমিযী হা/২১; নাসাঈ হা/৩৬, আবূদাঊদ হা/২৭।
[24]. নাসাঈ হা/৩২, পাত্রে প্রস্রাব করা অনুচ্ছেদ; ছহীহ আবূদাঊদ হা/১৯, হাসান ছহীহ।
[25]. ফিক্বহুস সুন্নাহ, ১/২৯ পৃঃ।
[26]. বুখারী হা/১৪২; মুসলিম হা/৮৫৭; মিশকাত হা/৩৩৭।
[27]. আবূদাঊদ হা/৩০; ইরওয়া হা/৫২; মিশকাত হা/৩৫৯।
[28]. আবূদাঊদ হা/৬; ইবনু মাজাহ হা/২৯৬; ছহীহাহ হা/১০৭০।
[29]. আবূদাঊদ হা/৪৫; ইবনু মাজাহ হা/৩৫৮ যে ব্যক্তি শৌচ করার পর মাটিতে হাত ঘষলো অনুচ্ছেদ; নাসাঈ হা/৫০; মিশকাত হা/৩৬০, হাদীছ হাসান।  
[30]. বুখারী হা/১৫৫ ‘ওযূ’ অধ্যায়
[31]মুসলিম হা/২৬৭(৬৩), ‘ডান হাত দিয়ে ইস্তেঞ্জা করা নিষেধ’ অনুচ্ছেদ; ছহীহুল জামে‘ হা/৭৭৮১।
[32]বুখারী হা/১৫৫, ৩৮৬০; আবূদাঊদ হা/৮; নাসাঈ হা/৪০; ইবনু মাজাহ হা/৩১২।
[33]আহমাদ, ছহীহুল জামে হা/৪৯১২।
[34]. বুখারী হা/১৫৫; তিরমিযী, নাসাঈ, মিশকাত হা/৩৫০।
[35]মুসলিম, ‘পবিত্রতা’ অধ্যায়, ‘পবিত্রতা অর্জন করা’ অনুচ্ছেদ; আবূদাঊদ হা/৭; তিরমিযী হা/১৬।
[36]. বুখারী হা/১৬১-১৬২; মুসলিম হা/২৩৭;মিশকাত হা/৩৪১।
[37]মুসলিম, ‘পবিত্রতা’ অধ্যায়, ‘পবিত্রতা অর্জন করা’ অনুচ্ছেদ; আবূদাউদ হা/৭; তিরমিযী হা/১৬।
[38]তামামুল মিন্নাহ পৃঃ ৬৫।http://at-tahreek.com/site/show/2799http://at-tahreek.com/site/show/2799

Monday, February 20, 2017

ভাষার ইতিকথা

আমাদের দেশের মানুষগুলো ভাষা বিচিত্র প্রকৃতি রূপের লক্ষ্য করা যায়।

Sunday, December 18, 2016

আমার শৈশব

একাটা আগন্ত শিশু জম্মের পর তার মায়ের কাছের সবচেয়ে মুলবান